Author Topic: এ কে খানের জীবনী  (Read 2568 times)

Rashadul Islam

  • Administrator
  • Newbie
  • *****
  • Posts: 45
  • Karma: +0/-0
    • View Profile
এ কে খানের জীবনী
« on: March 20, 2018, 03:58:29 PM »

এ কে খান ওরফে আবুল কাশেম খান ব্রিটিশের মুন্সেফগিরি ছেড়ে শিল্পায়নের জন্য যখন দুঃসাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন, তখন উপমহাদেশের মহাসংকটময় সময়। ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকে— তখন সমগ্র বিশ্বে চলছিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা, যার প্রভাব স্বাধীনতাপূর্ব অবিভক্ত বাংলায়ও কম অনুভূত হয়নি। বিশেষ করে অনগ্রসর মুসলমান সমাজের তরুণ সম্প্রদায়ের জন্য ছিল এ সময়টা বিশেষ সঙ্গিন। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির ক্ষেত্রে বাণিজ্য বা শিল্পে কোথাও তাদের অবস্থান সংহত ছিল না। ঠিক এমনই সময়ে একজন শিক্ষিত মুসলমান যুবকের পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের চাকরির মোহ বর্জন করে স্বাধীন ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করা খুব সহজ কাজ ছিল না। এ কে খান সেই অসহজ দুরূহ পথকেই বেছে নিয়েছিলেন।

এই জনপদে শিল্প ছিল না এ কথা বলা যাবে না সত্য, তবে ইংরেজ আমলে বিলেতের স্বার্থে এই অঞ্চলে বৃহৎ বা মাঝারি শিল্প গড়ে উঠুক, তা ইংরেজরা চাইত না। তাঁত শিল্প, চা শিল্প, জাহাজ ও লবণ শিল্পের উন্নতি তাদের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হতো। ১৯৪৭ সালের আগে বাংলার কোনো কোনো স্থানে বস্ত্র, চটকল ও কিছু কিছু রাসায়নিক শিল্প স্থাপিত হয়েছিল বটে, কিন্তু এটা খুব উল্লেখ্য ছিল না। শিল্পগুলো ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। বেশির ভাগ বস্ত্র শিল্প ও চামড়া শিল্প কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ ছিল শুধু কলকাতাভিত্তিক শিল্পের জন্য একটি কাঁচামাল সরবরাহকারী পশ্চাত্ভূমি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ এ ত্রিকালদর্শী শিল্প, ব্যবসা, রাজনীতি, মানবসেবার কিংবদন্তি পুরুষ এ কে খান ওরফে আবুল কাশেম খান। এ কে খান ব্লু-ব্লাড তথা রাজকীয় সম্ভ্রান্ত বংশের উত্তরাধিকারী। এ কে খান ১৯০৫ সালের ৫ এপ্রিল মোহরার বিখ্যাত জান আলী খান চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রাম রেলপথে জান আলীর নামে একটি রেলস্টেশনের নাম রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে গৌড়েশ্বরের মন্ত্রী সাইয়েদ শমশির খানের তৃতীয় পুত্র শেরবাজ খানের চতুর্থ অধস্তন পুরুষ জান আলী চৌধুরী এ কে খানের পিতামহ। কিন্তু বংশের এ আভিজাত্য, গৌরব ও ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে গেছে এ কে খানের নিজের কর্মের ঐশ্বর্য। লক্ষ্মী ও সরস্বতী যুগ্ম বলে এ কে খানের এক জীবনের আধারে অনেক জীবনের সাফল্য কানায় কানায় উপচে পড়েছে। বংশমর্যাদার সোনার তরীকে তিনি অপরিমেয় ফসলে পূর্ণ করে এত উচ্চতায় উপনীত করেন যে তাতে তার পূর্বপুরুষরা ম্লান হয়ে যান। তার খ্যাতি, অর্থ-প্রতিপত্তির ছটায় উদ্ভাসিত করে রেখেছিলেন বঙ্গের জনপদকে। তার সময়ের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে শীর্ষ ভূমিপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। পিতা আলহাজ আবদুল লতিফ খান মাতা ওয়াহাবুন্নিসা চৌধুরানী। তার পিতা টানা ১৬ বছর সুখ্যাতির সঙ্গে ফতেয়াবাদে সাব রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করেন।

এ কে খান যে দেশমাতৃকার সুযোগ্য সূর্য সন্তান হিসেবে পরিগণিত হবেন, তা তার ছাত্রজীবন থেকে ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠছিল। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রজীবনের প্রতিটি ধাপে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ফতেয়াবাদ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। ১৯২৭ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বি.এ. (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যাচেলর অব’ল ( বি. এল ) ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন।

তিনি শিক্ষাজীবন শেষে প্রথমে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন। পরে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় বাঙালি মুসলমান পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৩৫ সালে বেঙ্গল জুডিশিয়াল সার্ভিসের মুন্সেফ পদে যোগদান করেন। কখনো তিনি ন্যায়বিচারে আপস করেননি। তার বিচারক জীবনের দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ তপন রায় চৌধুরীর পিতা কংগ্রেসকর্মী অমিয় রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ফৌজদারি মামলা দায়ের করলে বিচারক মামলাটি আইনসম্মত হয়নি বলে নাকচ করে দেন। তপন রায় চৌধুরী তার বিখ্যাত গ্রন্থ বাঙ্গালনামায় এ ঘটনার উপসংহরে বলেন, ‘যে দুঃসাহসী বিচারক সরকারের আনা অভিযোগ নাকচ করেন তার নাম আবুল কাশেম খান।’

অপর ঘটনায় এ কে খান কোট্টাম নামক একজন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারকে এক ভারতীয় রাজনীতিবিদকে প্রহার করার অভিযোগে শাস্তি প্রদান করেন। সেই আমলে শ্বেতাঙ্গ আসামির ন্যায্য বিচার করে শাস্তি বিধান করা দেশী বিচারকের কাছে সহজ কাজ ছিল না। এ দুরূহ কাজ সম্পন্ন করে এ কে খান নির্ভীক ন্যায় বিচারক হিসেবে নিজের উন্নত ও বলিষ্ঠ চরিত্রের পরিচয় দান করেন।

এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ সরকার তাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘পানিশমেন্ট পোস্টে’ বদলি করে। সেখানে তাকে প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এ কে খান উপলব্ধি করেন যে ব্রিটিশ সরকারের আমলে ন্যায়বিচার করা তার জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ১৯৪৪ সালে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দেন। এ সংকটময় সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে তার জীবনসঙ্গী বেগম শামসুন নাহার খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত এ কে খানের জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার স্ত্রীর বিশাল অবদান রয়েছে। স্ত্রীর নামেই তার পাহাড়ি সবুজময় বাসভবনের নাম ‘শামা’ রেখেছেন।

তার পিতা চাইতেন তিনি চাকরিক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করুক। এ কে খান কর্মজীবন শুরু করেন— অবশ্যই তার শ্বশুরকুলের বেঙ্গল-বার্মা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানিখ্যাত ব্যবসায়ী ও স্বদেশী আন্দোলনের সংগঠক আবদুল বারী চৌধুরীর সহায়তায়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, আবদুল বারী চৌধুরীর আমন্ত্রণে মহাত্মা গান্ধী বার্মায় আসেন এবং তার জাহাজে সংবর্ধনা সভায় পূর্ববঙ্গের প্রথম মুসলমান এমবি ডা. এমএ হাসেম মানপত্র পাঠ করেন। কিন্তু পরে এ কে খান যেসব শিল্প সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন তার পেছনে যে চালিকাশক্তি সক্রিয় ছিল, তা তার একান্ত নিজস্ব সৃজনশীল প্রতিভা।

শিল্পায়নে ইনডিভিজুয়াল এন্টারপ্রাইজ বা ব্যস্টিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে আজকাল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে সুলভতা আমরা লক্ষ্য করছি, চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে তা তত সহজ ছিল না। কিন্তু সেই সময়ে এ কে খান এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন যে দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে যদি সমাজকে পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে পুঁজির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিরও একটা ফলপ্রসূ মিলনের প্রয়োজন এবং তার জন্য দরকার বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ কে খানের সব সফল শিল্প স্থাপনার পেছনে এ ভাবনার পরিচয় রয়েছে।

সূত্রমতে, জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত (১৯৮৮) ‘দক্ষিণ ভারতে বাজার ও বাজারজাতকরণ’ নামক বইয়ে এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। বইটি হিরুর্সি ইসিহারার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। বইটিতে টাটাকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশে এ কে খানকে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হিসেবে প্রথম স্থানে, গুল বখশ ভূঁইয়াকে দ্বিতীয় স্থানে এবং জহিরুল ইসলামকে তৃতীয় স্থানে দেখানো হয়েছে। এ জরিপটি বেশ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে চালানো হয়েছে। বইটিতে এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে— দি চিটাগং খান টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (১৯৫৪), এ কে খান প্লাইউড কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৭), এ কে খান ম্যাচ কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৯), এ কে ডকিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (১৯৫৯), খান এলিন করপোরেশন লিমিটেড (১৯৬২), এ কে খান জুট মিলস লিমিটেড (১৯৬৫), বঙ্গতরী শিপিং কোম্পানি লিমিটেড (১৯৭০), এসটিএম লিমিটেড (১৯৭৭), বেঙ্গল ফিশারিজ লিমিটেড (১৯৭৯), এ কে খান কোল্ড স্টোরেজ, ফিশ প্রসেসিং আইস, মেলিং প্রজেক্ট (১৯৮৫), এ কে নিট-ওয়ার (১৯৮৫), এ কে গার্মেন্টস (১৯৮৬)।

এ কে খানের মন্ত্রিত্বকালে চা, জুট, তামাক, কটন, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পগুলোর প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। তার সময় পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনকে কার্যকর ভূমিকা রাখবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠন করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি তার সময় খুলনায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে (১৯৫৯) নিউজপ্রিন্ট ও ডিডিটি ফ্যাক্টরি স্থাপনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

তার সময় বেশকিছু বাঙালি অফিসারকে শিল্পে প্রশিক্ষণ লাভের জন্য বিদেশ পাঠানো হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্থাপিত হয়। তার সময় দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শিল্পের উন্নতির জন্য পূর্ব পাকিস্তানের অংশ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য তা ছিল ৩৫.৪ কোটি টাকা। তার সময় ১৯৫৯ সালে ফরেস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন স্থাপিত হয়। চট্টগ্রাম কালুরঘাট উড ট্রিটিং প্লান্টটি তার সময়ে ১৯৬০ সালে এফআইডিসিকে হস্তান্তর করা হয়। তারই প্রচেষ্টায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান ৩১ নং অর্ডিন্যান্সের অধীনে ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয়। পূর্ব  পাকিস্তানের শিল্পায়নের ব্যাপারে এ ব্যাংক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। এ ব্যাংক ১৯৬২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ কে খানের সময় পূর্ব পাকিস্তানে বস্ত্র, চামড়া, ও রাবার, খাদ্যসামগ্রী, ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক, কাগজের মিল, নন মেটালিক, মিনারেল প্র্রডাক্ট, পাওয়ার খাতে প্রচুর ঋণ মঞ্জুর করে। তারই প্রচেষ্টায় ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ভেড়ামারা ও গোয়ালপাড়ায় ৮৫০০ কেডব্লিউ, ১৬০০০ কে ডব্লিউ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পাওয়ার স্টেশন স্থাপিত হয়। কর্ণফুলী হাইড্রো ইলেকট্রিক প্র্রজেক্ট বহুদিন ধরে ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছিল। তিনি তাতে গতিসঞ্চার করেন।

তারই সময়ে ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে তা বিদ্যুৎ উৎপাদন আরম্ভ করে। ইস্ট পাকিস্তানে পাওয়ার অ্যান্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি তারই প্রচেষ্টায় একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফসল, যার হেডকোয়ার্টার চট্টগ্রামে ছিল— সেই ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এ কে খান।

১৯৬১ সালে আমেরিকার একটি ফার্মকে দিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনার একটি পূর্ণ জরিপ করেন। এটি একটি মূল্যবান বই। এ ফার্মটির নাম আর্থার অ্যান্ড লিটিল ইনকরপোরেশন— তাদের রিপোর্টটির নাম হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভে অব ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬১।

আজকে বাংলাদেশ বিসিক, বেপজা, বেজা শিল্পাঞ্চলের যে কনসেপ্ট গড়ে উঠেছে, তার স্বাপ্নিক পূর্বসূরি হচ্ছেন এ কে খান। পাকিস্তানের উন্নয়নে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে’র ধারণা আবুল কাশেম খানের মস্ত বড় দান। পাকিস্তানের মতো একটা প্রাচ্য দেশের পক্ষে পাশ্চাত্যের ন্যায় পুঁজির সেই ভূমিকা ও সুযোগ লাভ করে উন্নতির ওইরূপ প্রচুর সময় পাওয়া যাবে না। সুযোগের সংকোচন সত্ত্বেও পাকিস্তানকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে উন্নয়নের প্রাথমিক স্তর উত্তীর্ণ হতে হবে।

এ কে খান মনে করতেন, কয়েকজন বৃহৎ পুঁজিপতি শিল্পকে কেন্দ্রীভূত করলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিল্পকে প্রসারিত করে সাধারণ মানুষকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে বহু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সমাবেশ করা যাবে। এখানে শিল্পের মালিকদের জমি, বাড়িঘর, কারখানা, বিজলী, ব্যাংক, কাঁচামালের সরবরাহ, উত্পন্ন পণ্যদ্রব্যের বিক্রি ব্যবস্থা— সব কিছুর সুবিধা দেয়া হবে। বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, স্কুল সবকিছু মিলে এস্টেটগুলো হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এলাকা। মুখ্যত বিদেশী বিনিয়োগ নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশে শিল্পায়ন করতে হবে।

মুসলমানদের জন্য আলাদা স্বাধীন আবাসভূমির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি, এজন্য ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অবতীর্ণ এবং ১৯৪৫ সালে মুসলিম লীগে যোগদান। তত্কালে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগে যোগদান। তত্কালে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের কার্যকরী কমিটির সদস্য। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইনসের (পিআইএ) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত, তবে জিন্নাহের নির্দেশে তাতে যোগদান থেকে বিরত। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আইনসভার সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে পাক প্রেসিডেন্ট আইউব খানের মন্ত্রিসভায় যোগদান এবং শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ বিভাগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ১৯৬২ সালে পদত্যাগ। ১৯৬২ সালের সংবিধান রচনা ও মূল্যায়নে তার অবদান রয়েছে। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় সদস্য। বিদ্যুত্মন্ত্রী হিসেবে তার সময়ে পাক-ভারতের মধ্যে সিন্ধু নদের পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন। শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বস্ত্র ও পাট শিল্পের দ্রুত প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ এবং দেশের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের প্রয়াস। এখানে চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানা, কর্ণফুলী রেয়নমিল স্থাপন। পশ্চিম পাকিস্তানেও অনুরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠা।

ঢাকায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের প্রস্তাব প্রদান, যাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এখানে বসতে পারে এবং অধিবেশনকালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ এখানে চলতে পারে। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় শেরেবাংলা নগর স্থাপন। মন্ত্রী থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা, বয়নশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন ও পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার সংকট নিরসনে রাজনৈতিক সমাধানের আশায় এয়ার মার্শাল আসগর খানের তেহরিকে ইশতেকলাল পার্টিতে যোগদান।

মুসলিম লীগার ও পাকিস্তানের মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এ কে খান নিরন্তর পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে সংগ্রাম করে গেছেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এম এন হুদা জানাচ্ছেন, পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির কার্যক্রমে পূর্ব পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদদের প্রাধান্য ছিল বেশি। এর জন্য পাকিস্তানিরা ঢাকা গ্রুপ অব ইকোনমিস্ট নামে প্রশংসা ও বিদ্রূপ দুটোই করতেন। হুদার তথ্যমতে, মন্ত্রী হিসেবে এ কে খান পূর্ব পাকিস্তানে ট্যাক্স হলিডে দীর্ঘতর করেছিলেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন হয়। চিটাগং চেম্বার সচিবালয় তথ্যমতে, এ কে খান কমার্স কলেজে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের তথ্য ও পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ এ তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যবহার করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতির সঞ্চার করে। এভাবেই এ কে খান একাত্তরের স্বাধীনতার আন্দোলনের বীজ বপন করেছিলেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী গং তাকে একাত্তরের শান্তি কমিটিতে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি এবং তার পরিবার যে ত্যাগ করেছেন, তা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে নিজ পরিবার নিয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিশে দেশের সীমানা অতিক্রম করে সম্পূর্ণ অনিশ্চিতের পথে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তার ভাই মাহবুবুর রহমান খানকে দুই পুত্রসহ হানাদার বাহিনীর হাতে প্রাণ দিতে হয়। তার কন্যা জামাতা মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সংগঠক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচর্যার কাজ করেছেন। তার সন্তানরা স্বদেশে ও বিদেশে মুক্তিযুদ্ধে কোনো না কোনো অবদান রেখেছেন। তিনি তার বুদ্ধি, মেধা, অভিজ্ঞতা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখতে সাহায্য করেছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন সেই ক্রান্তিলগ্নে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এ কে খান ইংরেজিতে অনুবাদ করে কালুরঘাট ট্রান্সমিটার সেন্টার থেকে সম্প্রচারের জন্য আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আবু মনসুর ও মোশারফ হোসেনের কাছে হস্তান্তর করেন।

এ লেখার শুরুতেই আমরা বলেছি, কর্ম ও সংগ্রামে এ কে খানের সোনার তরী ভরে গিয়েছিল। ৩১ মার্চ ১৯৯১ সালে এ মহাজন প্রয়াত হন। এর একদিন পূর্বে তিনি উইল এ একে খান শিল্পগোষ্ঠীর মোট লভ্যাংশের ৩০ শতাংশ জনশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্কলারশিপ খাতে ব্যয়ের নিমিত্তে দান করেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

১। এ কে খান ফাউন্ডেশন
২। নাসিরুদ্দীন চৌধুরী, দৈনিক পূর্বদেশ, রোববার, ৬ এপ্রিল ২০১৪
৩। এ কে খান স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদক হেলাল হুমায়ুন
৪। বার্ষিক কার্যবিবরণীসমূহ, সিসিসিআই
৫। এ কে খান স্মারকগ্রন্থের ওপর অভীক ওসমানের রিভিউ

 

লেখক: চিটাগং চেম্বারের সাবেক সচিব ও সিইও
খণ্ডকালীন শিক্ষক— নাট্যকলা বিভাগ, চবি
(সূত্র: বণিক বার্তা)
Regards,
Md. Rashadul Islam
Operation Manager
Bangladesh Venture Capital Ltd.